বাবা তুমি এমন করছো কেন? প্লিজ, এইসব পাগলামো ছাড়ো!!
ডক্টর স্যাম করুণ সুরে চিৎকার করে ওঠলো।
রাতের বেলগ্রেডের আকাশে অমাবস্যার ঘোর নিরবতা! আলোর বন্যায় পথঘাট ভেসে গেলেও দানিয়ুবের স্রোত বেয়ে বেয়ে এক দুঃখের প্রস্রবণ বয়ে আসছে স্যামের ঘরে।
এক সপ্তাহ যাবৎ প্রফেঃ রাফা উদ্ভট দাবিটি করে আসছেন। অর্ধশত বৎসর আগের পাপের প্রায়শ্চিত্য করতে চাইছেন স্যামের বাবা। বয়স ষাট পয়ষট্টির মতো অথবা একটু বেশিই হবে। ভাল নাম ডাক আছে এমন দুই জন সাইকিয়াট্রিস্টের কাছেও তাকে স্যাম নিয়ে গিয়েছিল। তিন তিনটি সাইকোলজিক্যাল টেস্ট করা হয়েছে। মাথায় তেমন কোন গোলমাল নেই। সুনির্দিষ্ট রোগের ক্যাটাগরিতে ফেলাও সম্ভব হয়নি।
অদ্ভুত বাসনা হলো তিনি এ পৃথিবীতে আর বেঁচে থাকতে চান না। ছেলে নিজের হাতে বালিশ দিয়ে চেপে যেন তাঁকে হত্যা করে। তাও মাঝরাতে, তিনি ঘুমানোর পর, যেকোন দিন। স্বাভাবিক পরিবেশে তাঁর অজান্তে এ কাজটা যেন ছেলে করে ফেলে।
অথচ মাসখানেক আগেও ওয়েস্ট সিটির কাউন্সিলর জিসান জকোভিচের মেয়ে জারার সাথে বিয়ের জন্য কথা পাকাপাকি করে এসেছিলেন, যারা কিনা এই শহরের সবচেয়ে অভিজাত পরিবার।
বেশিরভাগ চুলই পেকে গেছে। ভদ্রলোক বেলগ্রেড বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাস অনুষদে পড়ান। বাংলাদেশ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাস করে ইতালির মিলানে পুনরায় সেকন্ডারি এজুকেশন নিয়েছিলেন। এরপর ইউরোপের বড় বড় সব জায়গা ঘুরেছেন। ডক্টরেট করেছেন বার্লিন থেকে। বিয়েও করেছেন দীর্ঘদিনের সংগী সার্বিয়ান স্যামিন জোবানভিচকে। দেশে বিদেশে বিশ্ববিদ্যালয়সমুহে সম্মানিত হয়েছেন, নিমন্ত্রিত হয়েছেন বহুবার। এইরকম একজন স্মার্ট, সুশিক্ষিত, আধুনিক এবং সর্বোপরি বিঃখ্যাত ব্যক্তির ভাবমূর্তির সাথে এই ধরণের দাবি কোনভাবেই যায় না। একরোখা, অপরিবর্তনীয় সিদ্ধান্ত যেন নিয়ে রেখেছেন! লোকটি একদম অনঢ়।
প্রফেসরের সিদ্ধান্ত বদলাবার প্রচেষ্টায় মিসেস জকোভিচ এসেছিলেন একটু আগে। মেয়ের জামাইর বাবাকে এইরকম সিদ্ধান্ত নেয়াটা যে মোটেও যৌক্তিক নয়, সিম্পল এই ব্যাপারটা তিনি বোঝাতে র্যর্থ হয়ে চলেও গেলেন। ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে শ্বাশুরির সাদা মার্সিডিস গাড়ির দিকে হতাশ দৃষ্টিতে অশ্রুসজল চোখে তাই দেখছে স্যাম ও জারা। জারা সাধারণত সোসাইটির বেশ কিছু কাজ করে যা এখন বন্ধ করে ২৪ ঘন্টাই বাসায় থাকছে, যেহেতু স্যামের বাবা উল্টাপাল্টা আচরণ করছেন।
অনেক কিছুই ভাবছে স্যাম। জীবন নিয়ে রাফা অনেক বড় বড় কথা বলতেন। জীবনের মটিভেশন হলেন বাবা। অমনোযোগি ছাত্রদের জন্য বিশেষ কনফারেন্সে তার বাবাকে অনুরোধ করা হতো। মোটিভেশনাল স্পিচের জন্য কতই না বিখ্যাত তার বাবা। এই লোকটাকে কে বোঝাবে? কার সাধ্য আছে এমন?
যে লোকটা দেউলিয়া হয়ে যাওয়া জিওলভিকে পুনরায় কোটিপতি হবার জন্য মোটিভেশন লেটার পাটিয়েছিল মস্কোতে সেই লোক কিভাবে হুট করে এতটা পাল্টে যাবে? স্যামের মনের পর্দায় ভেসে ওঠলো ছোটবেলার এক দুর্ঘটনার কথা।
ফ্যান্টাসি ওয়ার্ল্ড থেকে বের হয়ে একবার একটা মিলিটারি গাড়ি তাদেরকে চাপা দিতে প্রায় কাছাকাছিই চলে এসেছিল। কোনকিছু বিকল্প না ভেবেই স্যামকে বুকে আঁকড়ে ধরে তিনি লাফ দিয়েছিলেন নীচে। পড়ে গিয়ে পা ভেংগেছিল তার বাবার। স্যাম এই ভালবাসার কোন মানে খুঁজে পায়নি। রক্তের সম্পর্ক কতটা শক্তিশালি হতে পারে সেটা বুঝতে হলে এই ধরণের ঘটনার সম্মুখীন হতে হয়।
ক্লাস টেনে পড়ার সময় স্যামের মনে মনে আকাংখা ছিল একটা প্লে স্টেশন কেনার। তাঁর বাবার মাসিক আয় খুব কম ছিল তখন। স্যাম কখনোই সেটা আশা করেনি। কিন্তু মাধ্যমিক পরিক্ষা শেষ করার পরের দিন সে বিস্মিত হয়েছিল। এত টাকা কোত্থেকে পেলেন তার বাবা?
বেশ পরে প্রতিবেশি জ্ঞাতি রিখার্ডোর কাছ থেকে জেনেছিল তিন মাস পায়ে হেঁটেছিলেন প্রফেসর রাফা! আর্থিক সংকট থাকলে নাকি প্রফেসররা এইরকম কাজ করে থাকে।
আচ্ছা বাবারা এত ভাল কেন হয়? সন্তানকে ভালবেসে তারা কি এমন সুখ পান?? বাবাদের কি নিজেদের স্বাদ আহ্লাদ থাকতে নেই??
অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আনমনে এইসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছিল স্যাম। কিন্তু কিছুক্ষনের মধ্যেই প্রফেসরের কান্ডজ্ঞানহীনতা নিয়ে ভেবে পুনরায় হতাশ হলো। শেষমেষ বড় দুই পেগ হুইস্কি গলায় ঢেলে মানসিক স্থিরতার জন্য ঘুমিয়ে পড়লো যেটা সচরাচর করতে তাঁকে দেখা যায় না।
জারা খুব ভোরে ঘুম থেকে ওঠলো আজ। কাল পরিস্কার করা হয়নি কিচেন। প্রথমে সেগুলো ধুতে শুরু করলো। ইদানিং এগুলো নিয়ে সে বেশ দক্ষতা অর্জন করে ফেলেছে।
তার কিছু সময় পরে ঘুম থেকে ওঠলো স্যাম। বেশ কিছুক্ষণ কাচের বারান্দায় হাঁটাহাঁটি করতে হলো তাঁকে। এরপর শাওয়ার নিয়ে সকালের নাস্তা করল।
সে যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে গেছে তার অনেক পরে ঘুম থেকে উঠেই জারা জকোভিচকে কোমল গলায় ডাক দিলেন প্রফেসর। কফি দিতে অনুরোধ করে তিনি কাঁপা কাঁপা পায়ে ওয়াশরুমে ঢুকলেন। বেলা করে ওঠায় তাকে কেমন যেন দেখাচ্ছে! ভদ্রলোক খুব সময়নিষ্ট মানুষ। এমনিতে কখনোই লেট করেন না, অফ-ডে হলেও না। বরং ছুটির দিনই বেশিরভাগ সময় তিনি ব্যস্ত থাকেন।
হুট করে কি থেকে কী হয়ে গেল কেউই ভেবে পেল না। বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলরের কাছে তিনি রেজিগনেশন লেটার দিয়ে বাসায় চুপচাপ থাকলেন। নিত্যদিনের রুটিন বাদ দিয়ে কেবল প্রাচীন বইপুস্তক পড়তে থাকলেন। খাওয়া দাওয়া সবই অনিয়মিত এক সপ্তাহ যাবত।
পানি ঝাপটা দিয়ে বের হবার সময় জারা বয়স্ক লোকটাকে দেখল। ডাইনিং এ না দিয়ে বাসকক্ষেই সে নিয়ে এসেছে পুরো নাস্তার ট্রে।
বৃদ্ধ লোকটা সারা রাত নিশ্চয়ই কেঁদেছে। চোখ দুটি ফোলা রয়েছে এখনো। হালকামতোন ভাঁজ হওয়া গালের চামড়া আজ যেন অনেক কুঁচকে গেছে। একমাস আগেও তাকে দেখে মনে হতো বয়স ৪০ এর কাছাকাছি বা সামান্য বেশি। অথচ এখন মনে হচ্ছে ৩০ দিনে ৩০ বৎসর বেড়ে গেছে বেচারার বয়স!
- বাবা! আপনি এইরকম করছেন কেন, আমাকে বলবেন?
- না রে মা। আমি পাপ করেছিলাম। পাপ। যে পাপের প্রায়শ্চিত্য না করলে আমি কোনদিনও শান্তি পাব না। ঐ ওপারে চলে গেলেও না।
- কি এমন পাপ! যে আপনাকে ছেলের হাতে খুন হতে হবে?
- না মা! এটা আমি বলতে পারবো না। বলা যায় না, আমি আর্নেস্ট হেমিংওয়ের মতো একদিন চলে যেতে পারি। তখন ছেলেকে বলিস আমার স্কুল লাইফের ডায়েরিটা যেন পড়ে। ঐটায় লিখে রেখেছি আমার পাপের ব্যাপারটা!
- ছিঃ বাবা! এইভাবে বলছেন আপনি!! একজন আধুনিক মানুষ হয়েও আপনি পাপ পুণ্যের হিসেব করছেন?
- স্যরি মা। আমি এগুলো নিয়ে আলাপ করতে চাই না। তুই বরং নিজের কাজ কর। আমাকে একটু একা থাকতে দে।
আর কোন উচ্চবাচ্য করলো না জারা। এমনিতেই সাইকো পাবলিক নিয়ে সে ভয় পায়। নার্সারিতে পড়ার সময় এক সাইকো মেডাম তাঁদের পড়াতেন। তিনি যে সাইকো ব্যাপারটা কেউ জানত না। তবে এটুকু জানা ছিল উনি রেগে গেলে বেশ ভয়ানক হন। কিন্তু বাচ্চাদের কাছে মনে হতো মানুষ থেকে অন্য ভয়ানক প্রাণির মতো আচরণ করতেন। জারার চোখে এখনো দিনের আলোর মতই ভাসে আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে গর্জন করে ম্যাম খপ করে তার হাত ধরে ফেলেছিলেন। লোহার ন্যায় শক্ত দাঁতগুলোর সাহায্যে ওর কচি হাতে কামড় দিয়ে রক্ত বের করে ফেলেছিলেন। সাথে সাথেই অন্য বাচ্চারা আতংকে চিৎকার করতে থাকে। প্রচন্ড গোলমাল শুনে পাশের ক্লাস থেকে স্যার/ম্যামরা এসে পড়েছিল। অনেক কষ্টে ঐ মহিলার হাত থেকে জারাকে উদ্ধার করা হয়।
এখন অনেক বড় হয়েছে সে। কিন্তু সেই ঘটনার পর থেকে মেন্টালি সিক/সমস্যা আছে এমন কারো কথা শুনলে অন্তত একবার ঢোক না গিলে সে পারে না। স্বভাবতই নতুন কোন ভয়/বিপদের আশংকা কমবেশি সে পাচ্ছে প্রফেসরের কাছ থেকে। অতএব সে হাল ছেড়েই দিল।
ঠিক ছেড়ে দিল যে, তাও আবার না। বরং ফোন করে ডায়েরিটা পাবার একটা চেষ্টা করলো। স্বামীর সাথে করা প্লান মোতাবেক সে বুদ্ধি করে সফট ঘুমের ওষুধও একসময় খাইয়ে দিল প্রফেসরকে। বেশ ভাল একটা ব্যাপার হলো প্রফেসরের ব্যক্তিগত বুকশেলফ এখন আর লক করা থাকে না। বইয়ের মাঝে মাঝে বেশ কিছু ডায়েরি আছেে। বেশিরভাগই ইংরেজিতে তবে রাশিয়ান, বাংলা, উর্দু এবং পার্সিয়ানও আছে। হিস্ট্রি নিয়ে ঘাটাঘাটি করতে গিয়ে তিনি বেশ কয়েকটি ভাষাও রপ্ত করতে পেরেছেন। বিশেষ করে ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাস বিশারদ হিসেবে পশ্চিমে তাঁকে বিশেষজ্ঞ হিসেবে গণ্য করা হয়।
প্রফেসর রাফা ঘুমে থাকতে থাকতেই ইউনি থেকে স্যাম চলে আসল। উর্দু/পার্সিয়ান/আরবি কেউই জানে না। তবে রাশিয়ান/সার্বিয়ান উভয়ই জানে। স্যাম অবশ্য বাংলা/ইংরেজি জানে ভালই।
সবমিলিয়ে প্রফেসরের লেখা ২৭ টি ডায়েরি তারা নিজেদের শয়নকক্ষে সরিয়ে আনল। চমৎকার হাতের লেখা স্যামের বাবার। এইরকম গুণী একজন মানুষের জন্ম দুর্নিতি-পীড়িত বাংলাদেশে। সে কখনো যায়নি ওখানে। সবচেয়ে বড় কথা স্যামের জন্মদাতা পিতা তিনি। এই লোকটি ছাড়া রক্ত সম্পর্কের কোন মানুষ এ পৃথিবীতে সে চিনেই না। বাংলাদেশে নাকি এখনো আছে তার চাচা ও চাচাত ভাই-বোনেরা। ২০-৩০ বছর পরে ওখানে গিয়ে নাকি কোন লাভ হবে না বলেই জানিয়ে আসছেন জ্ঞানোদয়ের পর থেকে তাকে। সেও তেমন জোরাজুরি করেনি। তবে এখন প্রফেসরকে নিয়ে স্টাডি করতে হবে। প্রাইভেসির ওপর আর সম্মান রাখলে আর চলছে না।
বাংলায় লেখা আছে ৪টি ডায়েরি। একটি ডায়েরির কাগজগুলো নিম্নমানের। স্যাম এটা খুব সাবধানে খুলল!
ডক্টর স্যাম করুণ সুরে চিৎকার করে ওঠলো।
রাতের বেলগ্রেডের আকাশে অমাবস্যার ঘোর নিরবতা! আলোর বন্যায় পথঘাট ভেসে গেলেও দানিয়ুবের স্রোত বেয়ে বেয়ে এক দুঃখের প্রস্রবণ বয়ে আসছে স্যামের ঘরে।
এক সপ্তাহ যাবৎ প্রফেঃ রাফা উদ্ভট দাবিটি করে আসছেন। অর্ধশত বৎসর আগের পাপের প্রায়শ্চিত্য করতে চাইছেন স্যামের বাবা। বয়স ষাট পয়ষট্টির মতো অথবা একটু বেশিই হবে। ভাল নাম ডাক আছে এমন দুই জন সাইকিয়াট্রিস্টের কাছেও তাকে স্যাম নিয়ে গিয়েছিল। তিন তিনটি সাইকোলজিক্যাল টেস্ট করা হয়েছে। মাথায় তেমন কোন গোলমাল নেই। সুনির্দিষ্ট রোগের ক্যাটাগরিতে ফেলাও সম্ভব হয়নি।
অদ্ভুত বাসনা হলো তিনি এ পৃথিবীতে আর বেঁচে থাকতে চান না। ছেলে নিজের হাতে বালিশ দিয়ে চেপে যেন তাঁকে হত্যা করে। তাও মাঝরাতে, তিনি ঘুমানোর পর, যেকোন দিন। স্বাভাবিক পরিবেশে তাঁর অজান্তে এ কাজটা যেন ছেলে করে ফেলে।
অথচ মাসখানেক আগেও ওয়েস্ট সিটির কাউন্সিলর জিসান জকোভিচের মেয়ে জারার সাথে বিয়ের জন্য কথা পাকাপাকি করে এসেছিলেন, যারা কিনা এই শহরের সবচেয়ে অভিজাত পরিবার।
বেশিরভাগ চুলই পেকে গেছে। ভদ্রলোক বেলগ্রেড বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাস অনুষদে পড়ান। বাংলাদেশ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাস করে ইতালির মিলানে পুনরায় সেকন্ডারি এজুকেশন নিয়েছিলেন। এরপর ইউরোপের বড় বড় সব জায়গা ঘুরেছেন। ডক্টরেট করেছেন বার্লিন থেকে। বিয়েও করেছেন দীর্ঘদিনের সংগী সার্বিয়ান স্যামিন জোবানভিচকে। দেশে বিদেশে বিশ্ববিদ্যালয়সমুহে সম্মানিত হয়েছেন, নিমন্ত্রিত হয়েছেন বহুবার। এইরকম একজন স্মার্ট, সুশিক্ষিত, আধুনিক এবং সর্বোপরি বিঃখ্যাত ব্যক্তির ভাবমূর্তির সাথে এই ধরণের দাবি কোনভাবেই যায় না। একরোখা, অপরিবর্তনীয় সিদ্ধান্ত যেন নিয়ে রেখেছেন! লোকটি একদম অনঢ়।
প্রফেসরের সিদ্ধান্ত বদলাবার প্রচেষ্টায় মিসেস জকোভিচ এসেছিলেন একটু আগে। মেয়ের জামাইর বাবাকে এইরকম সিদ্ধান্ত নেয়াটা যে মোটেও যৌক্তিক নয়, সিম্পল এই ব্যাপারটা তিনি বোঝাতে র্যর্থ হয়ে চলেও গেলেন। ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে শ্বাশুরির সাদা মার্সিডিস গাড়ির দিকে হতাশ দৃষ্টিতে অশ্রুসজল চোখে তাই দেখছে স্যাম ও জারা। জারা সাধারণত সোসাইটির বেশ কিছু কাজ করে যা এখন বন্ধ করে ২৪ ঘন্টাই বাসায় থাকছে, যেহেতু স্যামের বাবা উল্টাপাল্টা আচরণ করছেন।
অনেক কিছুই ভাবছে স্যাম। জীবন নিয়ে রাফা অনেক বড় বড় কথা বলতেন। জীবনের মটিভেশন হলেন বাবা। অমনোযোগি ছাত্রদের জন্য বিশেষ কনফারেন্সে তার বাবাকে অনুরোধ করা হতো। মোটিভেশনাল স্পিচের জন্য কতই না বিখ্যাত তার বাবা। এই লোকটাকে কে বোঝাবে? কার সাধ্য আছে এমন?
যে লোকটা দেউলিয়া হয়ে যাওয়া জিওলভিকে পুনরায় কোটিপতি হবার জন্য মোটিভেশন লেটার পাটিয়েছিল মস্কোতে সেই লোক কিভাবে হুট করে এতটা পাল্টে যাবে? স্যামের মনের পর্দায় ভেসে ওঠলো ছোটবেলার এক দুর্ঘটনার কথা।
ফ্যান্টাসি ওয়ার্ল্ড থেকে বের হয়ে একবার একটা মিলিটারি গাড়ি তাদেরকে চাপা দিতে প্রায় কাছাকাছিই চলে এসেছিল। কোনকিছু বিকল্প না ভেবেই স্যামকে বুকে আঁকড়ে ধরে তিনি লাফ দিয়েছিলেন নীচে। পড়ে গিয়ে পা ভেংগেছিল তার বাবার। স্যাম এই ভালবাসার কোন মানে খুঁজে পায়নি। রক্তের সম্পর্ক কতটা শক্তিশালি হতে পারে সেটা বুঝতে হলে এই ধরণের ঘটনার সম্মুখীন হতে হয়।
ক্লাস টেনে পড়ার সময় স্যামের মনে মনে আকাংখা ছিল একটা প্লে স্টেশন কেনার। তাঁর বাবার মাসিক আয় খুব কম ছিল তখন। স্যাম কখনোই সেটা আশা করেনি। কিন্তু মাধ্যমিক পরিক্ষা শেষ করার পরের দিন সে বিস্মিত হয়েছিল। এত টাকা কোত্থেকে পেলেন তার বাবা?
বেশ পরে প্রতিবেশি জ্ঞাতি রিখার্ডোর কাছ থেকে জেনেছিল তিন মাস পায়ে হেঁটেছিলেন প্রফেসর রাফা! আর্থিক সংকট থাকলে নাকি প্রফেসররা এইরকম কাজ করে থাকে।
আচ্ছা বাবারা এত ভাল কেন হয়? সন্তানকে ভালবেসে তারা কি এমন সুখ পান?? বাবাদের কি নিজেদের স্বাদ আহ্লাদ থাকতে নেই??
অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আনমনে এইসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছিল স্যাম। কিন্তু কিছুক্ষনের মধ্যেই প্রফেসরের কান্ডজ্ঞানহীনতা নিয়ে ভেবে পুনরায় হতাশ হলো। শেষমেষ বড় দুই পেগ হুইস্কি গলায় ঢেলে মানসিক স্থিরতার জন্য ঘুমিয়ে পড়লো যেটা সচরাচর করতে তাঁকে দেখা যায় না।
জারা খুব ভোরে ঘুম থেকে ওঠলো আজ। কাল পরিস্কার করা হয়নি কিচেন। প্রথমে সেগুলো ধুতে শুরু করলো। ইদানিং এগুলো নিয়ে সে বেশ দক্ষতা অর্জন করে ফেলেছে।
তার কিছু সময় পরে ঘুম থেকে ওঠলো স্যাম। বেশ কিছুক্ষণ কাচের বারান্দায় হাঁটাহাঁটি করতে হলো তাঁকে। এরপর শাওয়ার নিয়ে সকালের নাস্তা করল।
সে যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে গেছে তার অনেক পরে ঘুম থেকে উঠেই জারা জকোভিচকে কোমল গলায় ডাক দিলেন প্রফেসর। কফি দিতে অনুরোধ করে তিনি কাঁপা কাঁপা পায়ে ওয়াশরুমে ঢুকলেন। বেলা করে ওঠায় তাকে কেমন যেন দেখাচ্ছে! ভদ্রলোক খুব সময়নিষ্ট মানুষ। এমনিতে কখনোই লেট করেন না, অফ-ডে হলেও না। বরং ছুটির দিনই বেশিরভাগ সময় তিনি ব্যস্ত থাকেন।
হুট করে কি থেকে কী হয়ে গেল কেউই ভেবে পেল না। বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলরের কাছে তিনি রেজিগনেশন লেটার দিয়ে বাসায় চুপচাপ থাকলেন। নিত্যদিনের রুটিন বাদ দিয়ে কেবল প্রাচীন বইপুস্তক পড়তে থাকলেন। খাওয়া দাওয়া সবই অনিয়মিত এক সপ্তাহ যাবত।
পানি ঝাপটা দিয়ে বের হবার সময় জারা বয়স্ক লোকটাকে দেখল। ডাইনিং এ না দিয়ে বাসকক্ষেই সে নিয়ে এসেছে পুরো নাস্তার ট্রে।
বৃদ্ধ লোকটা সারা রাত নিশ্চয়ই কেঁদেছে। চোখ দুটি ফোলা রয়েছে এখনো। হালকামতোন ভাঁজ হওয়া গালের চামড়া আজ যেন অনেক কুঁচকে গেছে। একমাস আগেও তাকে দেখে মনে হতো বয়স ৪০ এর কাছাকাছি বা সামান্য বেশি। অথচ এখন মনে হচ্ছে ৩০ দিনে ৩০ বৎসর বেড়ে গেছে বেচারার বয়স!
- বাবা! আপনি এইরকম করছেন কেন, আমাকে বলবেন?
- না রে মা। আমি পাপ করেছিলাম। পাপ। যে পাপের প্রায়শ্চিত্য না করলে আমি কোনদিনও শান্তি পাব না। ঐ ওপারে চলে গেলেও না।
- কি এমন পাপ! যে আপনাকে ছেলের হাতে খুন হতে হবে?
- না মা! এটা আমি বলতে পারবো না। বলা যায় না, আমি আর্নেস্ট হেমিংওয়ের মতো একদিন চলে যেতে পারি। তখন ছেলেকে বলিস আমার স্কুল লাইফের ডায়েরিটা যেন পড়ে। ঐটায় লিখে রেখেছি আমার পাপের ব্যাপারটা!
- ছিঃ বাবা! এইভাবে বলছেন আপনি!! একজন আধুনিক মানুষ হয়েও আপনি পাপ পুণ্যের হিসেব করছেন?
- স্যরি মা। আমি এগুলো নিয়ে আলাপ করতে চাই না। তুই বরং নিজের কাজ কর। আমাকে একটু একা থাকতে দে।
আর কোন উচ্চবাচ্য করলো না জারা। এমনিতেই সাইকো পাবলিক নিয়ে সে ভয় পায়। নার্সারিতে পড়ার সময় এক সাইকো মেডাম তাঁদের পড়াতেন। তিনি যে সাইকো ব্যাপারটা কেউ জানত না। তবে এটুকু জানা ছিল উনি রেগে গেলে বেশ ভয়ানক হন। কিন্তু বাচ্চাদের কাছে মনে হতো মানুষ থেকে অন্য ভয়ানক প্রাণির মতো আচরণ করতেন। জারার চোখে এখনো দিনের আলোর মতই ভাসে আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে গর্জন করে ম্যাম খপ করে তার হাত ধরে ফেলেছিলেন। লোহার ন্যায় শক্ত দাঁতগুলোর সাহায্যে ওর কচি হাতে কামড় দিয়ে রক্ত বের করে ফেলেছিলেন। সাথে সাথেই অন্য বাচ্চারা আতংকে চিৎকার করতে থাকে। প্রচন্ড গোলমাল শুনে পাশের ক্লাস থেকে স্যার/ম্যামরা এসে পড়েছিল। অনেক কষ্টে ঐ মহিলার হাত থেকে জারাকে উদ্ধার করা হয়।
এখন অনেক বড় হয়েছে সে। কিন্তু সেই ঘটনার পর থেকে মেন্টালি সিক/সমস্যা আছে এমন কারো কথা শুনলে অন্তত একবার ঢোক না গিলে সে পারে না। স্বভাবতই নতুন কোন ভয়/বিপদের আশংকা কমবেশি সে পাচ্ছে প্রফেসরের কাছ থেকে। অতএব সে হাল ছেড়েই দিল।
ঠিক ছেড়ে দিল যে, তাও আবার না। বরং ফোন করে ডায়েরিটা পাবার একটা চেষ্টা করলো। স্বামীর সাথে করা প্লান মোতাবেক সে বুদ্ধি করে সফট ঘুমের ওষুধও একসময় খাইয়ে দিল প্রফেসরকে। বেশ ভাল একটা ব্যাপার হলো প্রফেসরের ব্যক্তিগত বুকশেলফ এখন আর লক করা থাকে না। বইয়ের মাঝে মাঝে বেশ কিছু ডায়েরি আছেে। বেশিরভাগই ইংরেজিতে তবে রাশিয়ান, বাংলা, উর্দু এবং পার্সিয়ানও আছে। হিস্ট্রি নিয়ে ঘাটাঘাটি করতে গিয়ে তিনি বেশ কয়েকটি ভাষাও রপ্ত করতে পেরেছেন। বিশেষ করে ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাস বিশারদ হিসেবে পশ্চিমে তাঁকে বিশেষজ্ঞ হিসেবে গণ্য করা হয়।
প্রফেসর রাফা ঘুমে থাকতে থাকতেই ইউনি থেকে স্যাম চলে আসল। উর্দু/পার্সিয়ান/আরবি কেউই জানে না। তবে রাশিয়ান/সার্বিয়ান উভয়ই জানে। স্যাম অবশ্য বাংলা/ইংরেজি জানে ভালই।
সবমিলিয়ে প্রফেসরের লেখা ২৭ টি ডায়েরি তারা নিজেদের শয়নকক্ষে সরিয়ে আনল। চমৎকার হাতের লেখা স্যামের বাবার। এইরকম গুণী একজন মানুষের জন্ম দুর্নিতি-পীড়িত বাংলাদেশে। সে কখনো যায়নি ওখানে। সবচেয়ে বড় কথা স্যামের জন্মদাতা পিতা তিনি। এই লোকটি ছাড়া রক্ত সম্পর্কের কোন মানুষ এ পৃথিবীতে সে চিনেই না। বাংলাদেশে নাকি এখনো আছে তার চাচা ও চাচাত ভাই-বোনেরা। ২০-৩০ বছর পরে ওখানে গিয়ে নাকি কোন লাভ হবে না বলেই জানিয়ে আসছেন জ্ঞানোদয়ের পর থেকে তাকে। সেও তেমন জোরাজুরি করেনি। তবে এখন প্রফেসরকে নিয়ে স্টাডি করতে হবে। প্রাইভেসির ওপর আর সম্মান রাখলে আর চলছে না।
বাংলায় লেখা আছে ৪টি ডায়েরি। একটি ডায়েরির কাগজগুলো নিম্নমানের। স্যাম এটা খুব সাবধানে খুলল!
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন